Sunday, January 20, 2008

আসাদের শার্ট- শামসুর রাহমান

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।

বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে
নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো
হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সূক্ষ্মতায়
বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট
উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে।

ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট
শহরের প্রধান সড়কে
কারখানার চিমনি-চূড়োয়
গমগমে এ্যভেন্যুর আনাচে কানাচে
উড়ছে, উড়ছে অবিরাম
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।

আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক ;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।


--------------------------------------------


আজ ২০ জানুয়ারি, শহীদ আসাদ দিবস। তাঁকে নিয়ে কবি শামসুর রাহমানের এই অমর কবিতাটি আজ এখানে দিলাম।

Friday, January 11, 2008

কবিতাঃ দেখা-অদেখা

তুমি তো আমাকে চেন না, আমিও চিনি না তোমার
ঘুমের গভীরে অথির তিমিরে ঘন নীলিমায়
তুমি আমি তবু পরস্পরের গ্রহদীপশিখা
দু'জনেরই মন দু'জনের কাছে দূর নীহারিকা
চাঁদের আলোয় খোঁজাখুঁজি করি খুঁজি যে আমায়।

তোমার নয়নে আমি অভিমান আমারও নয়নে
রাতের সজল কাজল তারকা শিথিল শয়নে
হাজার রাতের স্বপ্নে জড়ানো অনাগত কাল
হাজার দিনের সুচিরকাম্য সোনালী সকাল
দু'জনেরই সুখ অদেখা আলোর কুসুম চয়নে।

আমাকে তোমার ভালোলাগাটাতো অনাদি বাসনা
তোমাকে যে ভালোবাসবোই তুমি মানস- আসনা
অসীম মনের নীরবতা আর বিজনতা ঘেরা
ক্বচিৎ কখনো কাছে আসো তুমি কখনো আসো না।

আমি যে ঘুরি ঘুরে ঘুরে চলা পৃথিবীর বুকে
'ভালোবাসা' নাম দিয়েছি ঘোরার, আঙুল চিবুকে
যখনি রেখেছি বলেছ, ' কি এত ভাবছো বলো তো? '
কবিতায় লিখি এত কথা তবু দেখা তো হলো না।

Thursday, January 10, 2008

কবিতা

ফুল নেয়া ভালো নয় মেয়ে
ফুল নিলে ফুল দিতে হয়
ফুলের মতন প্রাণ দিতে হয়।

Tuesday, December 18, 2007

তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবো না- আবুল হাসান

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
তোমার ওখানে যাবো, তোমার ভিতরে এক অসম্পূর্ণ যাতনা আছেন,
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই শুদ্ধ হ' শুদ্ধ হবো
কালিমা রাখবো না!

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
তোমার ওখানে যাবো; তোমার পায়ের নীচে পাহাড় আছেন
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই স্নান কর
পাথর সরিয়ে আমি ঝর্ণার প্রথম জলে স্নান করবো
কালিমা রাখবো না!

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
এখন তোমার কাছে যাবো
তোমার ভিতরে এক সাবলীল শুশ্রূষা আছেন
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই ক্ষত মোছ আকাশে তাকা--
আমি ক্ষত মুছে ফেলবো আকাশে তাকাবো
আমি আঁধার রাখবো না!

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
যে সকল মৌমাছি, নেবুফুল গাভীর দুধের সাদা
হেলেঞ্চা শাকের ক্ষেত
যে রাখাল আমি আজ কোথাও দেখি না-- তোমার চিবুকে
তারা নিশ্চয়ই আছেন!

তোমার চিবুকে সেই গাভীর দুধের শাদা, সুবর্ণ রাখাল
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই কাছে আয় তৃণভূমি
কাছে আয় পুরনো রাখাল!
আমি কাছে যাবো আমি তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবো না!

Friday, March 30, 2007

অস্ত্র সমর্পণ- হেলাল হাফিজ

অস্ত্র সমর্পণ

হেলাল হাফিজ


মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার।
নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে, কেবল তোমাকে।
বিরোধী নিধন শেষে কতোদিন অকারণে
তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখেছি তোমাকে বারবার কতোবার।

মনে আছে, আমার জ্বালার বুক
তোমার কঠিন বুকে লাগাতেই গর্জে উঠে তুমি
বিস্ফোরণে প্রকম্পিত করতে আকাশ, আমাদের ভালবাসা
মুহূর্তেই লুফে নিত অত্যাচারী শত্রুর নি:শ্বাস।

মনে পড়ে তোমার কঠিন নলে তন্দ্রাতুর কপালের
মধ্যভাগ রেখে, বুকে রেখে হাত
কেটে গেছে আমাদের জঙ্গলের কতো কালো রাত!
মনে আছে, মনে রেখো
আমাদের সেই সব প্রেম-ইতিহাস।

অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে
সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে
মানুষকে ভালোবাসা ভালোবাসি বলে।

যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন,
যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে
ভেঙে সেই কালো কারাগার
আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।

Sunday, March 04, 2007

এক্স=প্রেম

x=prem.mp3


ঝিন্টি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস,
এই মেঘলা দুপুরে কত কাছাকাছি থাকতাম।
ঝিন্টি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস,
ঝরে পরতিস টিপ টুপ টাপ
গায়ে মাখতাম-।

-- শিলাজিৎ।

বন্ধু তোর লাইগা রে...

Bondhu Tor Laiga r...


বন্ধু তোর লাইগা রে আমার তনু জড় জড় ...
মনে লয় ছাড়িয়া রে যাইতাম, থুইয়া বাড়ি ঘর,
বন্ধু তোর লাইগা রে ...

-----------------
মূল গানঃ সৈয়দ শাহনুর

Friday, March 02, 2007

ভাবতেই পারো- প্রেয়ার হল

Punam - Bhabtei Pa...


ভাবতেই পারো ক্লান্ত কোন দুপুরে, ধূলো মেখে মেখে বেজে ওঠা নুপুরে,সুর মেলে ডানা আকাশেরও ওপরে।
যাও যদি সুদূরপানে, চেনা কোন অন্যখানে।
ভালোবাসা মেঘে ঘেরা, আসবে যে আমার মনে।
আজ তোমার মেঘে মেঘে রঙধনু, আজ তোমার মেঘে রঙ!
আজ তুমি মেঘে মেঘে যেমন ইচ্ছে তেমন-
ভালোবাসা নিয়ে আসি আজ আমি, মেঘে মেঘে সারাক্ষণ।

Tuesday, February 20, 2007

আঙুলের রক্তঃ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আঙুলের রক্ত
--------------

ঘর শব্দটি কবিতার মধ্যে এলে আমি তার দরজা দেখতে পাই না
অথচ দরজা শব্দটির একদিকে ঘর, আর একদিকে বারান্দা
বারান্দার পাশেই নিম গাছ
আমার শৈশবের নিম গাছের স্মৃতির ওপর বসে আছে একটা ইস্টিকুটুম পাখি

যদি ঐ পাখিটিকে আমি কখনো কবিতার খাঁচায় বসাই নি
শব্দের নিজস্ব ছবি তা শব্দেরই নিজস্ব ছবি
শরীরর শিহরন যেন মাটির প্রতিমার সর্বক্ষণ চেয়ে থাকা
যেমন পাথর ধুলো হয়ে যায় কিন্তু জল বার বার ফিরে আসে
কবিতায় কে যে কখন আসে জানি না
শুধু আমার আঙুল কেটে রক্ত পড়লে তা নিয়ে কবিতা লেখা হয় না।

Wednesday, October 18, 2006

লিরিক - চিলতে রোদে (অর্ণব)

চিলতে রোদে পাখনা ডোবায়
মুচকী হাসে শহরতলী
রোজ সকালে পড়ছে মনে
এই কথাটা কেমনে বলি?

বালিশ চাদর এপাশ ওপাশ
একটুখানি গড়িয়ে নেওয়া,
আলতো ঘুমেই দুঃখটাকে খানিক সুখের প্রলেপ দেওয়া।।


মাঝদুপুরে হঠাত সেদিন আচমকা সব পড়লো মনে
ব্যস্ত শহর ভিড় জমালো
তাক বুঝে ঠিক ফেললো কোনে।

রেতের বেলা একলা এখন জিড়োচ্ছে সব শহরতলী
চোখ দু'টো খুব পড়ছে মনে
এই কথাটা ক্যামনে বলি...।।

------------------------------------------------------------
গানের একটা ব্যপার হচ্ছে যত সুন্দর লিরিকই হোক না কেন সুর ছাড়া ঠিক স্বাদটা পাওয়া যায় না। তাই অর্ণবের এই ভীষণ চমতকার কথাগুলোর সাথে যদি সুরটুকুও কোনভাবে তুলে দিতে পারতাম...এই ভেবে আফসোস হচ্ছে।

Sunday, September 10, 2006

কবিতা-বোধ

আলো-অন্ধকারে যাই--মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়--শান্তি নয়--ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম ময়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে;
সব কাজ তুচ্ছ হয়--পন্ড মনে হয়;
সব চিন্তা--প্রার্থনার সকল সময়
শূণ্য মনে হয়,
শূণ্য মনে হয়।

... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...

আমারে সে ভালোবাসিয়াছে;
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা ক'রে চ'লে গেছে--যখন ডেকেছি বারে-বারে
ভালোবেসে তারে;
তবুও সাধনা ছিলো একদিন--এই ভালোবাসা
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা ক'রে গেছি; যে নক্ষত্র--নক্ষত্রের দোষ
আমার প্রেমের পথে বার-বার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালোবাসা--ধুলো আর কাদা--।

মাথার ভেতরে
স্বপ্ন নয়--প্রেম নয়--কোনো এক বোধ কাজ করে।
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মত ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়।
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...

-------------------------------------------------------
জীবনানন্দ দাশের "বোধ" কবিতার কিছু অংশ।

Wednesday, September 06, 2006

কবিতা ও অনুবাদ

The Ecstasy
Arthur Symons
---------------------

O what is this?
Mysterious and uncapturable bliss
That I have known, yet seems to be
Simple as breathe and easy as a smile,
And older than the earth.



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদ
------------------------

একি রহস্য, একি আনন্দরাশি !
জেনেছি তাহারে, পাইনি তবুও পেয়ে ।
তবু সে সহজে প্রাণে উঠে নিশ্বাসি,
তবু সে সরল যেন রে সরল হাসি--
পুরনো সে যেন এই ধরনীর চেয়ে ।


----------------------------------------------------
আমার কাছে মূলের চাইতেও অনুবাদটা অসাধারণ লেগেছিলো যখন প্রথম 'শেষের কবিতা'য় পড়েছিলাম।এখনও সেই মুদ্ধতা কাটে নি।

Tuesday, September 05, 2006

কবিতা "পরস্পর"

পরস্পর
জীবনানন্দ দাশ
---------------

পরী নয়, মানুষও সে হয়নি এখনও;
বলেছে সে, কাল সাঝরাতে
আবার তোমার সাথে
দেখা হবে?--আসিবে তো?--তুমি আসিবে তো?
দেখা যদি পেত !
নিকটে বসায়ে
কালো খোঁপা ফেলিত খসায়ে--
কী কথা বলিতে গিয়ে থেমে যেত শেষে
ফিক করে হেসে!
তবু, আরো কথা
বলিতে আসিত--তবু, সব প্রগলভতা
থেমে যেত!
খোঁপা বেঁধে, ফের খোঁপা ফেলিত খসায়ে--
সরে যেত, দেয়ালের গায়ে
রহিত দাঁড়ায়ে!
রাত ঢের--বাড়িবে আরো কি
এই রাত!--বেড়ে যায়, তবু চোখাচোখি
হয় নাই দেখা
আমাদের দুজনার!--দুইজন, একা!--

Monday, September 04, 2006

কবিতা

আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্নে দেখেছি যে তুমি
তোমার বাস্তবতা হারিয়ে ফেলেছো
এখনো কি সময় আছে তোমার জীবন্ত শরীর স্পর্শ করার
এবং যে ওষ্ঠ থেকে আমার অতি প্রিয় স্বর জন্ম নেয়
সেখানে চুম্বন দেবার?...
আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখেছি যে হয়তো
আমার পক্ষে আর জাগাই সম্ভব হবে না
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোই, আমার শরীর সব
রকম জীবন ও ভালোবাসার জন্য উন্মুক্ত......
আমি তোমার ভুরু ছুঁতে পারি, ওষ্ঠ ছুঁতে পারি এত কম......
আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখেছি, হেঁটেছি,
কথা বলেছি।
শুয়েছি তোমার ছায়ার সঙ্গে......


-------------------------------------------------------

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের "ছবির দেশে, কবিতার দেশে" বইতে পড়েছিলাম, সেই থেকে সবচেয়ে প্রিয় কবিতাগুলোর একটা হয়ে আছে। মূল কবিতা রোবেয়ার দেনো'র, এখানে সুনীলের অনুবাদ তুলে দিলাম। শিরোনাম জানা নেই।

Tuesday, May 23, 2006

আমার এ ঘর

আমার এ ঘর ভাঙ্গিলো যে বা,
আমি বাঁধি তাঁর ঘর,
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই -
যে মোরে করেছে পর।

----------------------

জসীম উদ্দীন এর কবিতা। পুরোটা মনে নেই।

Monday, May 08, 2006

উপেক্ষা

উপেক্ষা

নির্মলেন্দু গুণ
-------

অনন্ত বিরহ চাই, ভালোবেসে কার্পণ্য শিখিনি৷
তোমার উপেক্ষা পেলে অনায়াসে ভুলে যেতে পারি
সমস্ত বোধের উত্স গ্রাস করা প্রেম; যদি চাও
ভুলে যাবো, তুমি শুধু কাছে এসে উপেক্ষা দেখাও৷

আমি কি ডরাই সখি, ভালোবাসা ভিখারি বিরহে?

( দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী; ১৯৭৪)

নাস্তিক

নাস্তিক

নির্মলেন্দু গুণ
-------

নেই স্বর্গলোভ কিংবা কল্প-নরকের ভয়,
অলীক সাফল্যমুক্ত কর্মময় পৃথিবী আমার৷

চর্মচোখে যা যা দেখি, শারীরিক ইন্দ্রিয় যা ধরে,
তাকেই গ্রহন করি৷ জানি, নিরাকার অপ্রত্যক্ষ
শুধুই ছলনা, বিশ্বাস করি না ভাগ্যে, দেবতার বরে৷

আমার জগত্ মুগ্ধ বাস্তবের বস্তুপুঞ্জে ঠাসা,
তাই সে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, অতীন্দ্রিয় নয়৷
অন্ধতার বধ্যভূমি আমার হদৃয়৷

সেই শ্রেষ্ঠ মানব-সন্তান, যার মন মুক্ত ভগবান৷
আমার মস্তক নিত্য নত সেই নাস্তিকের তরে৷

(দূর হ দু:শাসন ; ১৯৮৩ )

এবারই প্রথম তুমি

এবারই প্রথম তুমি

নির্মলেন্দু গুণ
-----------------

ভুলে যাও তুমি পূর্বেও ছিলে
মনে করো এই বিশ্ব নিখিলে
এবারই প্রথম তুমি৷

এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না
ছিলে না আকাশে, নদী জলে ঘাসে
ছিলে না পাথরে ঝর্ণার পাশে৷
এবারই প্রথম তুমি৷

এর আগে তুমি কিছুতে ছিলে না৷
ফুলেও ছিলে না, ফলেও ছিলে না
নাকে মুখে চোখে চুলেও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷

এর আগে তুমি এখানে ছিলে না
এর আগে তুমি সেখানে ছিলে না
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷

রাতের পুণ্য লগনে ছিলে না
নীল নবঘন গগনে ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷

এর আগে তুমি তুমিও ছিলে না৷
এবারই প্রথম তুমি৷

(অচল পদাবলী, ১৯৮২ )

তুলনামূলক হাত

তুলনামূলক হাত
নির্মলেন্দু গুণ
------------------

তুমি যেখানেই স্পর্শ রাখো সেখানেই আমার শরীর৷
তোমার চুলের ধোয়া জল তুমি যেখানেই
খোঁপা ভেঙ্গে বিলাও মাটিকে;
আমি এসে পাতি হাত, জলভারে নতদেহ আর
চোখের সামগ্রী নিয়ে ফিরি ঘরে, অথবা ফিরি না ঘরে,
তোমার চতুর্দিকে শূন্যতাকে ভরে থেকে যাই৷

তুমি যেখানেই হাত রাখো, যেখানেই কান থেকে
খুলে রাখো দুল, কন্ঠ থেকে খুলে রাখো হার,
সেখানেই শরীর আমার হয়ে ওঠে রক্তজবা ফুল৷

তুমি যেখানেই ঠোঁট রাখো সেখানেই আমার চুম্বন
তোমার শরীর থেকে প্রবল অযত্নে ঝরে যায়৷
আমি পোকা হয়ে পিচুটির মতো
তোমার ঐ চোখের ছায়ায় প্রতিদিন খেলা করে যাই,
ভালোবেসে নিজেকে কাঁদাই৷

তুমি শাড়ির আঁচল দিয়ে আমাকে তাড়িয়ে দিলে
আমি রথ রেখে পথে এসে তোমারই দ্বৈরথে বসে থাকি
তোমার আশায়৷ তুমি যেখানেই হাত রাখো
আমার উদগ্রীব চিত্র থাকে সেখানেই৷ আমি যেখানেই
হাত পাতি সেখানেই অসীম শূন্যতা, তুমি নেই৷

( না প্রেমিক না বিপ্লবী; ১৯৭২ )

ফুলদানি

ফুলদানি

নির্মলেন্দু গুণ
----------

যেকোনো বাগান থেকে যেটা ইচ্ছে সেই ফুল,
যেকোনো সময় আমি তুলে নিয়ে যদি কভু
তোমার খোঁপায়, আহা, অজগর তোমার খোঁপায়
সাজাবার সুজোগ পেতাম--; তাহলে দেখতে লীলা,
তোমার শরীর ছুঁয়ে লাবণ্যের লোভন ফুলেরা
উদ্বেল হদৃয়ে নিত্য বিপর্যস্ত হতো, মত্ত মমতায়
বলতো আশ্চর্য হয়ে, হতো বলতেই;
" খোঁপার মতন কোনো ফুলদানি নেই৷ '

( প্রেমাংশুর রক্ত চাই, ১৯৭০ )